বাংলাদেশ টেলিভিশনের (বিটিভি) সংক্ষিপ্ত ইতিহাস ।

Ad

বাংলাদেশ টেলিভিশনের (বিটিভি) সংক্ষিপ্ত ইতিহাস ।



বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন চ্যানেল
বাংলাদেশ টেলিভিশন (বিটিভি) বাংলাদেশের সরকারি টেলিভিশন সংস্থা।যার মালিকানা গণপ্রজাতান্ত্রিক বাংলাদেশ সরকারের। এটি ২৫ ডিসেম্বর ১৯৬৪ হতে সাদা-কালো সম্প্রচার শুরু করে। সে সময় এটি পাকিস্তান টেলিভিশন নামে পরিচিত ছিল। মুক্তিযুদ্ধের পর এর নাম পরিবর্তন করে বর্তমান নাম রাখা হয়। ১৯৮০ থেকে এটি রঙিন সম্প্রচার শুরু করে। এর প্রধান সম্প্রচার কেন্দ্র ঢাকা শহরের রামপুরা এলাকায় অবস্থিত। এছাড়া
চট্টগ্রাম শহরের পাহাড়তলী এলাকায় এর একটি স্থানীয় সম্প্রচার কেন্দ্র রয়েছে।  বিটিভি,  বিটিভি ওয়ার্ল্ড , সংসদ বাংলাদেশ টেলিভিশন, বিটিভি চট্টগ্রাম নামের ৪ টি চ্যানেলের মাধ্যমে সারাদেশে সম্প্রচার করার হয়। এশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য, আফ্রিকার আংশিক এলাকায় বিটিভি সম্প্রচার করা হয় । ২০০৪ সালে বিটিভি বিশ্বব্যাপী সম্প্রচারের জন্য বিটিভি ওয়ার্ল্ড নামে উপগ্রহভিত্তিক চ্যানেল স্থাপন করে।

পাকিস্তান আমলে প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খানের উদ্যোগে পাকিস্তানে টেলিভিশন আনা হয়। তিনি ২৭ নভেম্বর ১৯৬৪ সালে পাকিস্তানের লাহোরে প্রথম টেলিভিশন সেন্টারের উদ্বোধন করেন। দ্বিতীয় টেলিভিশন সেন্টারটি করা হয় বাংলাদেশে (তখন পূর্ব পাকিস্তান)। ঢাকায় ডি.আই.টি ভবনে (বর্তমান রাজউক ভবন ) ১৯৬৪ সালের ২৫ ডিসেম্বর পাকিস্তান টেলিভিশন কর্পোরেশনের ঢাকা কেন্দ্র উদ্বোধন করা হয়। টেলিভিশনে প্রথম প্রচারিত অনুষ্ঠানে প্রথম গান গেয়েছিলেন ফেরদৌসী রহমান, গানটি ছিল আবু হেনা মোস্তফা কামালের লেখা এই যে আকাশ নীল হল আজ / এ শুধু তোমার প্রেমে । টেলিভিশন কেন্দ্রের প্রথম প্রযোজক ছিলেন মুস্তাফা মনোয়ার , জামান আলী খান ও মনিরুল ইসলাম; পরবর্তীতে আসেন শহীদ কাদরী, আবদুল্লাহ আল মামুন , সৈয়দ আবদুল হাদী , দীন মোহাম্মদ , মোহাম্মদ জাকারিয়া , আতিকুল হক চৌধুরী। আর অনুষ্ঠান বিভাগের প্রথম ব্যবস্থাপক ছিলেন কলিম শরাফী। সেসময় টেলিভিশনে প্রযুক্তির অভাবের কারণে সব অনুষ্ঠান লাইভ অর্থাৎ সরাসরি সম্প্রচার করা হতো এবং চ্যানেল ছিল একটি, চলতো সন্ধ্যা সাড়ে ছয়টা থেকে রাত সাড়ে এগারোটা পর্যন্ত। টিভির সম্প্রচার সীমা ছিল ঢাকা শহরের চারপাশে দশ মাইল, তবে এর বাইরে ময়মনসিংহ, কুমিল্লা, ফরিদপুর থেকেও তা দেখা যেত। ঢাকা টেলিভিশনের স্থাপনা তৈরি, পুরোপুরি চালু করা ও কিছুদিন দেখাশোনা করার দায়িত্বে ছিল জাপানি টেলিভিশন কোম্পানি এনএইচকে । ঢাকা টেলিভিশন প্রথমে সাদাকালো হিসেবে শুরু হলেও পরে ১৯৮০ সাল থেকে রঙিন সম্প্রচার করা শুরু করে। মুক্তিযুদ্ধের পর সংস্থাটির নাম দেয়া হয় বাংলাদেশ টেলিভিশন (বিটিভি) এবং এটির রাষ্ট্রায়ত্তকরণ করা হয়। ১৯৭৫ সালে ডিআইটি ভবন ছেড়ে রামপুরায় টেলিভিশনের নিজস্ব ভবন তৈরি করা হয়। এখন সেটি রামপুরা টেলিভিশন সেন্টার নামে পরিচিত।

অতীতে বিটিভি অনেক জনপ্রিয় অনুষ্ঠান করতো তার মধ্যে কিছু উল্লেখ্যযোগ্য হলো 

যদি কিছু মনে না করেন (১৯৬৭-৬৮, ১৯৮২-৮৫)
ফজলে লোহানীর উপস্থাপিত ম্যাগাজিন-জাতীয় অনুষ্ঠান। সেসময় করাচি টেলিভিশনে গর তু বুরা না মানে নামে একটি অনুষ্ঠান চলছিল, এই অনুষ্ঠানটি সেটির সাথে খানিকটা সাদৃশ্যপূর্ণ। কিছুদিন পর লোহানী লন্ডনে চলে যান এবং অনুষ্ঠানটি বন্ধ হয়ে যায়। পরে ১৯৮২ সালের দিকে দেশে ফিরে তিনি অনুষ্ঠানটি পাক্ষিকভাবে আবার শুরু করেন। এবার অনুষ্ঠানটিতে বিনোদনের অংশে মূল কাজ করেন হানিফ সংকেত, লোহানী থাকেন প্রতিবেদন অংশে। ১৯৮৫ সালে লোহানীর মৃত্যুর পর অনুষ্ঠানটি বন্ধ হয়ে যায়।

হারজিত (১৯৭৩-৭৪)
আবদুল্লাহ আবু সায়ীদের নির্মিত ও উপস্থাপিত ধাঁধার অনুষ্ঠান। অনুষ্ঠানটিতে দেখুনো বিভিন্নরকম ধাঁধার মধ্যে একটি ছিল "কবির লড়াই"। কবিতার মাধ্যমে আলাপ চালানোর এই লড়াইয়ে সেসময় অংশ নিয়েছিলেন রুদ্র মহম্মদ শহীদুল্লাহ , জাহিদ হায়দার , মুহম্মদ নূরুল হুদা প্রমুখ তরুণ কবিগণ।


সপ্তবর্ণা (১৯৭৫-৭৬)
আবদুল্লাহ আবু সায়ীদেরই আরেকটি ধাঁধার অনুষ্ঠান। হারজিতের চেয়ে বড় পরিসরে এটি আয়োজন করা হয়েছিল। এই অনুষ্ঠানের মাধ্যমেই সেসময় নবপরিচিত পপসংগীতকে (এখন ব্যান্ডগান ) প্রথম জাতীয় কোনো গণমাধ্যমে উপস্থাপন করা হয়। অনুষ্ঠানের গাননির্ভর ধাঁধাগুলোয় অংশ নেন পপশিল্পী ফেরদৌস ওয়াহিদ, ফিরোজ সাঁই , ফকির আলমগীর ও পিলু মমতাজ । অনুষ্ঠানটির শেষ পর্বে পপশিল্পী আজম খানও উপস্থিত হন এবং তার নতুন গান আলাল ও দুলাল গেয়ে শোনান। অনুষ্ঠানটির জন্য সায়ীদ ১৯৭৭ সালে শ্রেষ্ঠ টিভি উপস্থাপকের পুরস্কার লাভ করেন।


আপনার ডাক্তার (১৯৭০ দশক)
খ্যাতিমান ডাক্তার একিউএম বদরুদ্দোজা চৌধুরী (পরবর্তীতে বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি ) চিকিৎসাবিষয়ক এই অনুষ্ঠানটি উপস্থাপনা করতেন এবং এর জন্য ১৯৭৮ সালে শ্রেষ্ঠ টিভি উপস্থাপকের পুরস্কার লাভ করেন।


আনন্দমেলা (১৯৭৫-বর্তমান)
আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ এই অনুষ্ঠানের মাধ্যমেই "ম্যাগাজিন অনুষ্ঠান" নামক ধারাটি সৃষ্টি করেন। শুরুতে ১৯৭৫ সালে ঈদ উপলক্ষে এই বিনোদনমূলক অনুষ্ঠান তৈরি করা হয়, প্রথম ৫ বছরে এর ১০টি পর্ব প্রচারিত হয়, যার আটটি সায়ীদ করেছিলেন; পরবর্তীতে অন্য অনেকে এটি উপস্থাপনা করে চলেছেন। বিটিভি এটিকে ঈদের মূল অনুষ্ঠান হিসেবেই প্রচার করে থাকে।


চতুরঙ্গ (১৯৭৮-৭৯)
আনন্দমেলার পর আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ এই ম্যাগাজিন অনুষ্ঠানটি শুরু করেন। নাচ, গান, নাটিকা, ধাঁধা সবকিছু মিলিয়ে নিজস্ব উপস্থাপনায় তিনি অনুষ্ঠানটিকে জনপ্রিয় করে তোলেন। এই অনুষ্ঠানের মাধ্যমেই জাদুকর জুয়েল আইচকে জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন।


ভরা নদীর বাঁকে (১৯৯০ দশক)
মোস্তফা জামান আব্বাসীর উপস্থাপিত গ্রামবাংলার লোকসংগীত বিষয়ক অনুষ্ঠান।


ইত্যাদি (১৯৮৯-বর্তমান)
হানিফ সংকেতের নির্মিত ও উপস্থাপিত ম্যাগাজিন অনুষ্ঠান। এটি প্রথমে পাক্ষিক, পরে মাসিক এবং এখন ত্রৈমাসিকভাবে প্রচারিত হয়; তবে ঈদ উপলক্ষে বিশেষ পর্বের আয়োজন করা হয়।


শুভেচ্ছা (১৯৯৭?)
আবদুন নূর তুষার এই বিনোদনমূলক ম্যাগাজিন অনুষ্ঠানটি প্রচার করেন।


মাটি ও মানুষ
শাইখ সিরাজের উপস্থাপিত কৃষিবিষয়ক অনুষ্ঠান।


সময়ের কথা
সৈয়দ মুনির খসরুর পরিকল্পনা ও উপস্থাপনা এবং আবদুন নূর তুষারের পরিচালনায় দৈনন্দিন সামাজিক-রাজনৈতিক বিষয়ে আলোচনা, খানিকটা টকশোর মতো।


সিসিমপুর (২০০৪-বর্তমান)
পুতুল দিয়ে তৈরি শিশুতোষমূলক অনুষ্ঠান।


নতুন কুঁড়ি (১৯৬৬-,১৯৭৬-২০০৬)
মুস্তফা মনোয়ারের এই অনুষ্ঠানটি ছিল মূলত শিশুশিল্পীদের নিয়ে।
বিটিভি জাতীয় বিতর্ক মাতৃভাষা


সেই সময়ের কিছু  জনপ্রিয় নাটকঃ


মুখরা রমণী বশীকরণ (১৯৬০ দশক)
উইলিয়াম শেক্সপিয়রের লেখা নাটক
টেমিং অফ দ্য শ্রুর অনুবাদ করেন মুনীর চৌধুরী এবং মুস্তাফা মনোয়ার সেটি নিয়ে নাটক পরিচালনা ও প্রযোজনা করেন। নাটকটিতে মূল অভিনেতা ও অভিনেত্রী ছিলেন গোলাম মোস্তফা ও আজমীরী জামান (রেশমা)।

সংশপ্তক,কোথাও কেউ নেই,আজ,রবিবার,বহুব্রীহি,নক্ষত্রের রাত


কিছু আন্তর্জাতিক অনুষ্ঠানও প্রচার করা হতো যেমন

স্পেলবাইন্ডার ,স্পেলবাইন্ডার- ল্যান্ড অফ দ্যা ড্রাগন লর্ড ,কেয়ার বেয়ারস,ডালাস,ফেয়ারী টেল থিয়েটার,আলিফ লায়লা,ফ্যামিলি টাইস,নাইট রাইডার,ম্যাকগাইভার,মিয়ামি,ভাইস,পারফেক্ট স্ট্রানজারস,রভেন,স্মার্ফস,দ্যা বিল কসবি শো,দ্যা গার্ল ফ্রোম টুমোরো,দ্যা টুইলাইট জোন,দ্যা এক্স-ফাইলস,থান্ডার ক্যাটস,টুইন পিকস,জুয়েল ইন দ্য প্যালেস,রবিনহুড,ইনক্রেডিবল হাল্ক

দেখতে দেখতে বিটিভি ৫৬ বছরে পাদার্পন করলো । বিটিভি অতীতে অনেক গৌরব ছিল কিন্তু সেই অতীত এখন আর নেই আমরা আশা করি বিটিভি ভবিষৎতে আমাদেরকে ভালো ভালো অনুষ্ঠান উপহার দিবে ।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্য