বাংলাদেশের ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস।

Ad

বাংলাদেশের ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস।



১৯৪৭ সালের আগস্ট মাসে ব্রিটিশ শাসনাধীন ভারতীয় উপমহাদেশ স্বাধীন হয় এবং ভারত বিভক্ত হয়ে দুটি পৃথক স্বাধীন রাষ্ট্রের জন্ম হয়। মুসলিম অধ্যুষিত এলাকা নিয়ে গঠিত হয় পাকিস্তান এবং হিন্দু ও অন্যান্য ধর্মাবলম্বী অধ্যুষিত অঞ্চল নিয়ে গঠিত হয় ভারত। নবগঠিত রাষ্ট্র পাকিস্তান দুই হাজার মাইলের ব্যবধানে অবস্থিত দুটি প্রদেশের সমন্বয়ে গঠিত হয় - পূর্ব পাকিস্তান (বর্তমান বাংলাদেশ) ও পশ্চিম পাকিস্তান। ভৌগোলিক ও সাংস্কৃতিক দিক দিয়ে বিশাল ব্যবধানে অবস্থিত এ দুটি অংশের মধ্যে মিল ছিল কেবল সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের ধর্মে। পাকিস্তানের জন্মলগ্ন থেকেই এর পূর্ব অংশ পশ্চিম অংশের তুলনায় নানাভাবে বঞ্চিত হতে থাকে এবং স্বাধীন বাংলাদেশের জন্মের আগ পর্যন্ত দীর্ঘ ২৩ বছর ছিল পশ্চিম পাকিস্তান কর্তৃক পূর্ব পাকিস্তানকে শোষণ-বঞ্চনার ইতিহাস।

ভাষা আন্দোলন পটভূমি

পাকিস্তান সৃষ্টির আগেই এর রাষ্ট্রের ভাষা কী হবে তা নিয়ে বিতর্ক শুরু হয় ১৯৩৭ সালে মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ মুসলিম লীগের দাপ্তরিক ভাষা উর্দু করার প্রস্তাব করলে বাঙ্গালীদের নেতা শেরে এ বাংলা একে ফজলুল হক এর বিরোধীতা করেন। ১৯৩৭ সালের এপ্রিল মাসে পাকিস্তান নামক একটি রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠা যখন প্রায় নিশ্চিত হয়ে যায় তখনই বিতর্ক পুনরায় শুরু হয় ১৯৪৭ সালের ১৭ মে চৌধুরী খালেকুজ্জামান এবং জুলাই মাসে আলীগড় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ডক্টর জিয়াউদ্দিন আহমেদ উর্দুকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা করার প্রস্তাব দেয় তাদের প্রস্তাবের বিরুদ্ধে পূর্ব বাংলার ভাষা বিজ্ঞানী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ডঃ মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ এবং ডঃ মোঃ এনায়েত হকসহ বেশ কয়েকজন বুদ্ধিজীবী প্রবন্ধ লিখে প্রতিবাদ জানান। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আবুল কাসেমের নেতৃত্বে ২রা সেপ্টেম্বর ১৯৪৭ সালে তমুদ্দিন মজলিস নামক একটি সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠে।  ১৯৪৭ সালের ডিসেম্বর মাসে করাচীতে অনুষ্ঠিত এক শিক্ষা সম্মেলনে উর্দুকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা করার সিদ্ধান্ত গৃহীত হলে পূর্ববাংলার তীব্র প্রতিবাদ শুরু হয় এবং বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবি উঠে ডিসেম্বর মাসেই রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ গঠিত হয় । ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, সচিবালয়সহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে মিছিল সভা-সমাবেশ অনুষ্ঠিত। ১৯৪৮ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি পাকিস্তান গণপরিষদ সদস্য ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত গণপরিষদে উর্দু ও ইংরেজির পাশাপাশি বাংলাকে রাখার দাবি জানান সেই দাবি মানা হয়নি তাই ২৬ ও ২৭ ফেব্রুয়ারি ঢাকায় ধর্মঘট পালিত হয় । এরপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ পূর্ণ গঠিত হয় এই সংগঠন ১১ই মার্চ বাংলা ভাষা দাবি দিবস পালনের ঘোষণা দেয়।১৯৪৮ সালের ৪ঠা জানুয়ারি প্রতিষ্ঠিত পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগ এ কর্মসূচি পালনে বিশেষ ভূমিকা পালন। রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই স্লোগানসহ মিছিল ও পিকেটিং করা অবস্থায় শেখ মুজিব, শামসুল হক, অলি আহমদসহ ৬৯ জনকে গ্রেপ্তার করা হয় তখন থেকে দেশে অরাজক পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়।তৎকালীন ছাত্র নেতা শেখ মুজিবুর  রহমানকে গ্রেফতার ও নির্যাতনের প্রতিবাদে ঢাকায় ১২ থেকে ১৫ ই মার্চ ধর্মঘট পালিত হয়। বাধ্য হয়ে পূর্ব পাকিস্তানের মুখ্যমন্ত্রী খাজা নাজিমুদ্দিন রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের সঙ্গে ৮ দফা চুক্তি স্বাক্ষর করেন। যদিও খাজা নাজিমুদ্দিন ৮ দফা স্বাক্ষর করেন কিন্তু হাজার ১৯৪৮ সালের ১৯শে মার্চ পাকিস্তানের গভর্নর জেনারেল মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ ঢাকায় আসেন । ২১ মার্চ রেসকোর্স ময়দানে তিনি ঘোষণা করেন উর্দু এবং উর্দুই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা । ২৪ শে মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তনে তিনি একই ঘোষণা দিলে ছাত্রসমাজ প্রতিবাদ মুখর হয়ে উঠে এবং না না বলে তার  প্রতিবাদ জানায় । পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার অল্প কয়েক মাসের মধ্যেই পূর্ব বাংলায় ভাষা কেন্দ্রিক যে আন্দোলন শুরু হয় তা ছিল বাঙালি জাতীয়তাবাদের প্রতি আস্থার বহিঃপ্রকাশ মাতৃভাষা বাংলাকে রক্ষার মাধ্যমে পূর্ববাংলার জনগণ জাতীয়ভাবে নিজেদের বিকাশের গুরুত্ব উপলব্ধি করে এদেশে বসবাসকারী ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীগুলো রাষ্ট্রভাষা উর্দু নয় বরং বাংলাকেই সমর্থন করে। ১৯৫২ সালের ২৬ শে জানুয়ারি ঢাকার পল্টন ময়দানে অনুষ্ঠিত জনসভায় পাকিস্তানের নতুন প্রধানমন্ত্রী খাজা নাজিমুদ্দিন জিন্নাহর অনুকরণে উর্দুকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা করার নতুন ঘোষণা প্রদান করেন এর প্রতিবাদে ছাত্র সমাজ  ৩০ শে জানুয়ারি ধর্মঘট পালন করেন । আবদুল মতিনকে আহ্বায়ক করে রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ গঠিত হয় নতুনভাবে আন্দোলন সংগঠিত হতে থাকে এর সঙ্গে রাজনৈতিক দলগুলো যুক্ত হয় ৪ঠা ফেব্রুয়ারি ঢাকায় ২১শে ফেব্রুয়ারি ধর্মঘট পালন করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়।

ভাষার দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত সংগ্রাম চালিয়ে যাওয়ার সংকল্প ঘোষণা করা হয় কারাবন্দি নেতা শেখ মুজিবুর ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থাকা অবস্থায় একুশে ফেব্রুয়ারির কর্মসূচি পালনে আওয়ামী মুসলিম লীগের নেতা-কর্মীদেরকে পরামর্শ দেন। কেন্দ্রীয় কারাগারে মুক্তির দাবিতে আমরণ অনশন শুরু করলে আন্দোলন তীব্র হয়ে ওঠে । ২১শে ফেব্রুয়ারি থেকে ১৪৪ ধারা জারি করা হয় সভা-সমাবেশ নিষিদ্ধ করা হয় সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আমতলায় (বর্তমান ঢাকা মেডিকেল কলেজের জরুরি বিভাগে পাশে) একটি সভা অনুষ্ঠিত হয় সভায় সিদ্ধান্ত হয় ঢাকা মেডিকেল কলেজে ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে মিছিল এগিয়ে যাবে মিছিলে পুলিশ লাঠিচার্জ ও কাঁদানে গ্যাস নিক্ষেপ করে এক পর্যায়ে পুলিশ গুলিবর্ষণ করলে আবুল বরকত, জব্বার, রফিক, সালাম সহ আরো অনেকেই শহীদ হন অনেকে আহত হন ঢাকায় ছাত্র হত্যার খবর সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ে। ২২ শে ফেব্রুয়ারি ঢাকায় ছাত্র হত্যার প্রতিবাদে মিছিলে পুলিশের গুলিতে শফিউর রহমান নিহত হয়।  শহীদ স্মৃতি মনে রাখার জন্য ঢাকায় ২২ শে ফেব্রুয়ারি ছাত্রজনতা মেডিকেল কলেজের সামনে একটি শহীদ মিনার নির্মাণ করেন দেশে প্রথম শহীদ মিনার ২৩শে ফেব্রুয়ারি উদ্বোধন করেন শফিউর এর পিতা । ১৯৪৭ সালে সূচিত রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন ১৯৪৮ থেকে ১৯৫২ সালে প্রতিবাদ রক্তক্ষয়ী সংগ্রামে লাভ করে ফলে পাকিস্তান সরকার বাংলাকে অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দিতে বাধ্য হয়।  ১৯৫৬ সালে পাকিস্তানের সংবিধানে বাংলা ভাষাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয় নিজের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি নিয়ে পূর্ব বাংলার বাঙালি এবং অন্যান্য জনগোষ্ঠীর মাথা উঁচু করে দাঁড়ানোর সাহস, আত্মপ্রত্যয় খুজে পায়। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের পঞ্চাশের দশক বাঙালির আত্মনিয়ন্ত্রণ অধিকার প্রতিষ্ঠার প্রস্তুতিকাল সকল রাজনৈতিক আন্দোলনে তাদের অধিকার সম্পর্কে সচেতন করে পাকিস্তানের জাতীয় মুক্তির প্রথম আন্দোলন।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্য