আনিসুল হকের বিখ্যাত উপন্যাস “মা” এর বিশেষ কিছু অংশ।

Ad

আনিসুল হকের বিখ্যাত উপন্যাস “মা” এর বিশেষ কিছু অংশ।



বাঙালি জাতির জন্য স্মরণীয় একটি দিন  ১৬ ডিসেম্বর , হয়তো ১৯৭১ সালে ১৬ ডিসেম্বর দিনটি না থাকলো আমরা আজকেও অন্যের অধীনে থাকতাম । কিন্তু না আমাদের বাঙালি জাতির জীবনে এই দিনটি এসেছিল বলে আমরা ধন্য । আমাদের দেশের অকুতোভয় মুক্তিযোদ্ধারা , বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর ২৫ মার্চের সেই কালো রাতে স্বাধীনতার ঘোষণায় যুদ্ধে ঝাপিয়ে পরে এদেশের জনগন এবং ৩০ লক্ষ মানুষের জীবনের বিনিময়ে ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশ স্বাধীনতা অর্জন করে । যেসব মুক্তিযোদ্ধা তাদের জীবন বিলিয়ে দিয়েছিলেন দেশের তরে তাদের মধ্যে একজন হচ্ছের শহীদ আজাদ ।“ মা” উপন্যাসটিতে কবি আনিসুল হক শহীদ আজাদের এবং তার মায়ের ঘটনা তুলে ধরেছেন যেটি পড়লে মনকে নারা দিয়ে দেয় । নিচের অংশটি “মা” উন্যাসের একটি বিশেষ অংশ।
অন্য আরো বেশ কয়েকজনের সাথে আজাদকেও সেদিন ধরে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল তেঁজগাও পুরাতন বিমানবন্দরের কাছের এক এমপি হোস্টেলে , ছোট একটি রুমে , সামনে বসা আর্মি ক্যাপ্টেন হেজাজি । একে একে আজাদকে প্রশ্ন করে সে , কোন প্রশ্নেরই উত্তর দেয় না আজাদ। সারা রাত তার উপর অত্যাচার হয়, আর্মি জওয়ানরা মারতে থাকে থাকে , জ্ঞান হারায় আজাদ , পানি দিয়ে জ্ঞান ফিরিয়ে কিছুক্ষনের বিরতি , তারপর আবার চলে নির্যাতন। প্রথম রাতের ইন্টারোগেশনে কোন তথ্যই বের করতে পারে না । প্রায় ১৮ ঘন্টা পর এক সুবেদার এর কিছু দয়ায় বন্দীদের কাছে রুটি আর চিনি আসে , কিন্তু খাওয়ার মত অবস্থায় ছিল না কেউই, বন্দীদের সরিয়ে নেয়া হয় রমনা থানায়। এতগুলো মানুষের জন্য অল্প কিছুভাত দেয়া হয়, আজাদ হাতমুখ ধুতে গিয়ে দেখে তার জন্য কোন ভাত নেই সব শেষ।
৩১ শে আগস্ট আজাদকে আবার নেয়া হয় জিজ্ঞাসাবাদের জন্য , এবার কাগজে স্টেটমেন্ট নেয়া হবে , এবারও আজাদ সকল কষ্ট সহ্য করে চুপ করে থাকে, আর্মি অফিসার আজাদ সম্পর্কে পাওয়া সব তথ্য ভালমত দেখে বুঝতে পারে ছেলের মা কে দিয়ে বলালে হয়ত ছেলে সব স্বীকার করবে। মায়ের আজাদের সাথে দেখা করানোর ব্যবস্থা করা হল। আজাদের মাকে বলা হল ছেলেকে যেন বুঝায় , ছেলে রাজসাক্ষী হলে প্রতিদান স্বরুপ তাকে ক্ষমা করে দেয়া হবে। তার সাথের সহযোদ্ধাদের সব তথ্য আর অস্ত্রের সব তথ্য দিলেই হবে। মা কি করে নিজের ছেলেকে বেইমান হতে বলবেন ?
মা ছেলের দেখা হল।
মা বললেন , “বাবারে যখন মারবে , তখন শক্ত থেকো, কারো নাম বলে দিও না।“
ছেলে মায়ের কাছে ভাত খাওয়ার আবদার করল , মা কথা দিলেন সে ছেলের জন্য ভাত নিয়ে আসবে ।
পরদিন সকালে আবার ইন্টারোগেশনে নেয়া হয় আজাদকে , অফিসারের ধারনা ছিল মা হয়ত ছেলেকে বুঝিয়েছে , কিন্তু তার ধারনা ভুল । অফিসার অন্য সৈন্যদের ইশারায় নির্দেশ দিলেন , সৈন্য বুঝতে পারল কি নির্দেশনা এসেছে । তারা প্রস্তুতি নিল ।
পরদিন সন্ধ্যায় আজাদের মা আসে ভাত নিয়ে , পুলিশ কর্মকর্তারা আজাদ নামে বন্দি তালিকায় কাওকেই পেল না। থানা থেকে আজাদের মা যায় এমপি হোস্টেলের ইন্টারোগেশন সেলে , সেখানেও আজাদ নামে কেউ নেই.......১৬ই ডিসেম্বর ১৯৭১ , বাতাসে দেশ বিজয়ের খবর ঘুরে বেড়াচ্ছে , আজাদের মা ছেলের জন্য ভাত রান্না করে, স্বাধীন দেশ...... ছেলে ফিরে আসবে...... ভাত খাবে। ।
দিন পেরিয়ে রাত তারপর আবার দিন আসে , আজাদ ফিরে আসে না ......
একজন এসে আজাদের মাকে বলে মগবাজারে আজাদ ভাইয়ের নামে ব্যানার টানানো হয়েছে । আজাদের মা সেটি দেখতে জান, গিয়ে দেখেন ব্যানারে বড় করে লেখা
" শহীদ আজাদ , অমর হোক "
আজাদ নিখোজ হওয়া থেকে মারা যাওয়ার সময়ের দির্ঘ ১৪ বছর তিনি ভাত মুখে দেননি , খাটে শুয়ে ঘুমাননি ।
কারন তার একমাত্র ছেলে জীবনের শেষ সময় টুকুতে ভাত খেতে চেয়েছিল , পায়নি ।
ঘুমানোর জন্য বিছানা পায়নি ।
১৯৮৫ সালের ৩০ শে আগস্ট আজাদের মা মারা যান।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্য